ক্ষ এর সোনার বাংলা, জাতীয় সংগীত, ও চিলের কান।

আমার সোনার বাংলা গানটি রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ও নিজে সুরারোপ করেছেন “আমি কোথায় পাবো তারে” লোকগানের সুরের অনুকরণে। ঐ গানের প্রথম দশলাইন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। তথাপি জাতীয় সংগীত হিসাবে গ্রহন করার সময়ে এর গাইবার ধরণে কিঞ্চিত পরিবর্তন আছে বলে জানা যায়। খুব সম্ভবত জাতীয় সংগীত হিসাবে গৃহিত হওয়ার সময়ে “চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি” একটানে গাওয়া হবে বলে ঠিক করা হয়, অথচ রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীদের বরাতে বলা হয় রবীন্দ্রনাথের আসল গানে “চিরদিন তোমার আকাশ” গাওয়ার পরে থেমে আবার শুরু থেকে “চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি” গাইতে হবে। যাইহোক বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত গাইছে বলে উল্লেখ করে যদি কেউ এই গান গায়, তাকে অবশ্যই জাতীয় সংগীতের অংশটুকু মানে দশলাইন সরকারী ভাবে যে সুরে যেভাবে গৃহীত হয়েছে সেই ভাবেই গাইতে হবে। এর অন্যথা করলে সেটি বর্তমান নিয়মানুযায়ী জাতীয় সংগীতের অবমাননা হবে। কেউ যদি এই অবমাননার বিষয়ে বক্তব্য দিয়ে থাকেন সেটা আইনগতভাবে সঠিক বক্তব্যই দিয়েছেন। আপনি যদি এই নিয়ম সমুহের পরিবর্তন চান সেটা ভিন্ন বিতর্ক। ক্ষ ব্যান্ড যদি জাতীয় সংগীত গেয়েছে বলে উল্লেখ করে হঠাৎ করে “কী শোভা কী ছায়া” থেকে গাওয়া শুরু করে থাকে, আর জাতীয় সংগীতের সুরের আদল বাদ দিয়ে নিজেদের সুরে গেয়ে থাকে তবে তারা অবশ্যই গর্হিত কাজ করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে ক্ষ ব্যান্ড কি জাতীয় সংগীত গেয়েছে?

“আমার সোনার বাংলা” গানটি জাতীয় সংগীত হিসাবে না গেয়ে যে কোন ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের গান হিসাবে এটাকে গাইতে পারে, সেক্ষেত্রে তিনি দশ লাইনের বাইরেও গাইবেন কিনা, অথবা কোথা থেকে শুরু করবেন, কী ধরনের সুরে গাইবেন, সেটা তার ব্যাপার। আমার জানার পরিসরে ক্ষ ব্যান্ডকে জাতীয় সংগীত হিসাবে ঐ গান গাওয়ার কথা বলতে বা দাবী করতে শুনা বা দেখা যায় নাই। তারা কেবল নিজেদের মতো করে আমার সোনার বাংলা গানটি গেয়েছে। কাজেই জাতীয় সংগীতের এখানে অবমাননা হয়েছে বলে আমি কিছুতেই মনে করি না, স্পষ্ট কথা হচ্ছে ক্ষ জাতীয় সংগীত গায় নি। অাবারো পরিস্কার করে বলি জাতীয় সংগীত হচ্ছে আমার সোনার বাংলার প্রথম দশ লাইন সাথে যে সুর সরকারী ভাবে গৃহীত হয়েছে সেটি। কেউ সৎ মনে জাতীয় সংগীত গাইতে চাইলে, তাকে নিয়ম অনুযায়ী সেভাবেই গাইতে হবে, আর জাতীয় সংগীত হিসাবে গাইতে না চাইলে সেটা পুরোই আলাদা ব্যাপার। ক্ষ জাতীয় সংগীত গেয়েছে বলে দাবী করেছে এই প্রমাণ কেউ দেখাতে পারলে অবশ্য অামার এই মন্তব্য অার প্রযোজ্য হবে না। সেক্ষেত্রে জাতীয় সংগীতের অবমাননার অপরাধ তাদের হয়েছে বলে ধরে নেয়া যাবে।

অামার বক্তব্য অারো পরিস্কার করার জন্য মিল খুঁজে পাওয়া যায় এরকম আরেকটি উদাহরণ আনি। “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী” গানটি প্রথমবার সুর করেছিলেন আব্দুল লতিফ। কিন্তু সেটি জনপ্রিয় হয় নাই। পরে আলতাফ মাহমুদ আবার সুরারোপ করেছিলেন, যেই সংস্করণটি একুশে ফেব্রুয়ারীর প্রভাত ফেরীতে জনপ্রিয় হয়েছে। পুরোটা হয়তো সরকারী বিষয় নয় এখানে, কিন্তু সুর ও কথা সব মিলিয়ে দ্বিতীয় সংস্করণটি হল একুশে ফেব্রুয়ারীর অনুষ্ঠানাদির জন্য। প্রথমটি নয়। কেউ চাইলে প্রথম সুরে, বা আরো কোন নতুন সুরে ঐ গান গাইতে পারেন, তাতে একুশে ফেব্রুয়ারীর অবমাননা হবে না। গানের কথার উপরে নতুন নতুন সুরারোপ আর উপন্যাসের ভিন্ন ভিন্ন চিত্রায়ন খানিকটা মেলানো যেতে পারে। একই উপন্যাসের কত ভিন্নরকমের চিত্রায়ন হচ্ছে বলাই বাহুল্য, উদাহরণ হিসাবে শরতের দেবদাসের কথা বলা যায়। তবে শরৎ নিজে যদি কোন চিত্রায়ন করে থাকেন, সেটাকে হয়তো আমরা আসল বলতে পারি। “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো” কবিতার গানের রূপায়নে আসল নকলের বিষয় নেই, কারণ কবি নিজে সেখানে সুরারোপে যান নি। “আমার সোনার বাংলা” গানটির সুরারোপ সংশ্লিষ্ট কবি নিজে করেছিলেন। কাজেই অন্য যে বা যারাই নতুন সুর বা গায়কী আরোপ করুন, সেগুলোকে হয়তো আমরা আসল বলতে পারি না। তবে তাতে সুরারোপের শিল্পমুল্যে তেমন হের ফের হবে না। প্রতিটি সংস্করনের কারুকাজ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার দাবী রাখে।

যারা ক্ষ এর গাওয়া আমার সোনার বাংলাকে জাতীয় সংগীত বলছেন তারা কি আসলে বুঝে শুনে এটি বলছেন? আমার পর্যবেক্ষন হল বুঝে শুনে বলছেন না। তাদের অনেকের উপলব্ধিই নেই কখন “আমার সোনার বাংলা” আমাদের জাতীয় সংগীত আর কখন এটি নয়। অামার সোনার বাংলা শোনা মাত্রই সেটাকে জাতীয় সংগীত বলে ঠাওর করা আসলে এক রকমের বাল্য খিল্যতা। এই বাল্য খিল্যতা করার সম্ভাবনা বেশী তৈরী হয় যখন অাম জনতার বাইরে খানিকটা পেশাদার কেউ গানটি করে থাকেন। ক্ষ এর ক্ষেত্রে যেমনটি ঘটেছে। বিষয়টি আরো পরিস্কার হতে পারে যদি আমরা বিবেচনায় আনি বাংলাদেশী নয় এমন কেউ যেমন পশ্চিম বাংলার কেউ গানটি গাইছেন সেটি। ওরকম অ-বাংলাদেশী কেউ স্বাভাবিকভাবে কেনইবা বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত গাইতে যাবেন।

আসলে পুরো বিষয়টিতে তালগোল লাগার কারণ হল ফেসবুক নিবাসী ক্লিকপ্রিয় স্লাকটিভিস্ট গোষ্ঠি দেশপ্রেমের পরাকাষ্ঠা দেখাতে গিয়ে গানটি শুনে যেন হঠাৎ করে তাদের মনের গহনে নতুন দেশ প্রেম আবিস্কার করে ফেলেছে। তারা এটিকেই নতুন জাতীয় সংগীত হিসাবে ভাবা শুরু করে দিয়েছেন। আর অন্যেরাও সেটা না বুঝেই চিলের কান নেয়ার মতো করেই সেটা নিয়ে মাতামাতি করছেন। এই চিলের কান নেয়া গোষ্ঠির কেউ কেউ হয়তো বলার চেষ্টা করছেন জাতীয় সংগীত এর আগে কখনো এত মধুর লাগে নি, অথবা জাতীয় সংগীত শুনতে শুনতে নাকি কানে কড়া পড়া গিয়েছিল, ইত্যাদি। এসবের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথকেও বেশ কটু কথা বলা হচ্ছে, কারণ গানটিতে সুরারোপ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ নিজে। অাপনি যদি রবীন্দ্রভক্ত হয়ে থাকেন, তাহলে আমার পরামর্শ মন্তব্য করায় সাবধান হোন, অজান্তে একে বারেই যা তা বলছেন আপনি। আর যদি রবীন্দ্রবিদ্বেষী হয়ে থাকেন, তাহলে ক্ষ এর সুরে আপনার অধিকতর ভাল লাগবে। কারণ রবীন্দ্রনাথের সুরের চেয়ে ক্ষ এর সুর ভাল এটা আপনার রবীন্দ্রবিদ্বেষ চর্চায় সাহায্য করবে। আর রবীন্দ্রনাথের সুরে নিরপেক্ষভাবেই আপনার কানে কড়া পড়ে থাকলে, রবীন্দ্রনাথের দিন বাংলায় ফুরাতে চলেছে, সেটা বলা যেতে পারে। সাথে হয়তো রবীন্দ্রনাথের সোনার বাংলায় বর্ণিত গ্রাম বাংলার সাথে আপনার সম্পর্কও ফুরাতে চলেছে।

ক্ষ গানটি বেশ গেয়েছেন। আন্তর্জালে প্রথম ঢেউয়ে লিংক পাওয়া মাত্রই আমি তা শুনেছি। ভিন্ন স্বাদে গানটি বেশ ভাল লেগেছে। মধ্যবিত্তের ব্যস্ত একলা জীবনে ড্রয়িংরুমে বসে অবসাদে বিষাদে মনের কল্পনায় গ্রাম বাংলার লোভনীয় চিত্র দেখার তীব্রবাসনা ফুটিয়ে তোলার এই ঢং, যেখানে দেশ প্রেম কেবল খাঁচায় বন্দি পাখির মুক্তির জন্য আকুলি বিকুলী। ক্ষ তার পরিবেশনায় ও সুরের উঠানামায় “কী শোভা, কী ছায়ার” প্রশান্তি থেকে উচ্চলয়ে উঠতে উঠতে “ওমা ফাগুনে তোর”, “ওমা অঘ্রানে তোর” অংশের ক্লাইমেক্সের সপ্তমার্গে আমাদের দেশপ্রেমের হাহাকার সুচারু ভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। গানের কথার উলটপালটের এটা একটা বড় কারণ বলে আমার মনে হয়। সর্বোপরি দেশের কথার চেয়ে পুরো বিষয়টিতে যে গাচ্ছে বা শুনছে তার মনের অবস্থা গানের পরিবেশনায় মুখ্য বলে প্রতীয়মান হয়।আজকের জমানার “অাপনাপাগল” মধ্যবিত্তের একারণে এটি ভালই লাগবে। ভাললাগবে স্বদেশের-প্রবাসের বর্তমান প্রজন্মের হাজারো ফেসবুকচারী বন্ধুদের, ভার্চুয়াল জগতের মহামায়ার জালে যারা প্রতিনিয়ত বন্দী।

ক্ষ এর সুরের বিপরীতে রবীন্দ্রনাথের সুরের গানটি কোরাস গাওয়ার সাথে দেশাত্নবোধ প্রখর ভাবে জাগিয়ে তোলার গান। ঐ গান ঘরের বাইরে মাঠে প্রান্তরে গেয়ে গ্রাম বাংলার আকাশ বাতাসের সাথে আক্ষরিক ভাবে মিশে যাওয়ার গান। গানটি আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে উজ্জ্বীবিত করার কাজে অসংখ্যবার ব্যবহৃত হয়েছে। দলগত উদ্দীপনা জাগানোর জন্য আমার কাছে এটি অতুলনীয়। রবীন্দ্রনাথের অন্য অনেক গান মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমের জন্য, “আমার সোনার বাংলা” গানটির প্রচলিত সুর সেরকম ছিল না। ক্ষ য়ের পরিবেশনায় “আমার সোনার বাংলা” গানের ড্রয়িংরুম সংস্করণ পাওয়া গেল। এটা একটা প্রাপ্তি। হয়তো এর আগেও কেউ এরকমটি করেছেন বা করার চেষ্টা করেছেন। তবে পরিস্কার ভাবে ক্ষ এর প্রচেষ্টাটি আজকের যোগাযোগ প্রযুক্তির কল্যানে ক্লিকে ক্লিকে ছড়িয়ে পড়েছে।

উপরোক্ত অালোচনার বাইরে গানের কারিগরী মুল্যায়ন আমার গন্ডির বাইরে, অধিকতর শিল্প সমালোচনাও আমার এক্তিয়ারের বাইরে। গানের জগতে অনভিজ্ঞ হিসাবে গানের সুর বলতে আমি সুর, তাল, লয় এই রকম যা কিছু আছে সব একসংগে বুঝিয়েছি, গায়কীর ভংগিমা তা থেকে আলাদা করতে চেয়েছি। তবে আসলত্ব ও নতুনত্ব বিবেচনায় আমি আরো কিছু কথা বলতে চাই। শিল্প সাহিত্য ও বিজ্ঞানের জগতে এ রকমের অসংখ্য পরীক্ষা নিরীক্ষা হতে থাকবে, হতেই থাকবে। তার সবগুলো হয়তো ভাল হবে না, সবগুলো হয়তো খুব বেশী মন্দও হবে না। এগুলো স্বাভাবিক নিয়মে চলতে দেয়াই ভাল। এগুলোর সবগুলো যে কালোত্তীর্ণ হবে, তাও নয়। ক্ষ এর গানটিও সময়ের পরিক্রমায় কতটা পথ যাবে এই পর্যায়ে বলা মুশকিল।

শেষকরি অন্য কিছু বিষয় দিয়ে যেমন জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার সরকারী কঠোর নিয়ম বিষয়ে বলে। এগুলোকে বর্তমান নিয়মানুযায়ী অানুষ্ঠানিকতার কড়া ঘেরাটোপে বন্দী করে ফেলা হয়েছে। পেশাদারীত্বের জন্য হয়তো সেটা ঠিক আছে। কিন্তু আমজনতার দেশ প্রেম চর্চায় এগুলো বাধা। আমি দেশকে ভালবাসি, আমার ইচ্ছামতো আমি কেন পতাকা উড়াতে পারবনা আমার বাড়ীতে, অথবা গাড়িতে, অথবা আমার কপালে পতাকার ফেট্টি কেন বাঁধতে পারব না! তাছাড়া আজকের হৈহুল্লোড় পাগল উচ্ছাসে ভেসে যাওয়া তারুন্য আর বিশ্ব বানিজ্যিকীকরনের দুনিয়ায় আমাদের জাতীয়তার কিছু সংকেত ও প্রতীক দরকার যেগুলো যথা তথা যে কোন কাঠামোতে ব্যবহার করা সম্ভব। জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকার অবয়ব নিয়ে এখন নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হবে, তারুন্যের উচ্ছাস ও বানিজ্যিকীকরনের স্বার্থে সেগুলো করতে হবে। এখানে কেতাদুরস্ত সরকারী নিয়মকানুনের বালাই থাকবে না, এটা উপলব্ধি করা সম্ভবত জরুরী। এ সব পরীক্ষা নিরীক্ষাকে নেতিবাচক ভাবে কেউ চাইলে দেখতে পারেন, মনে করতে পারেন অবমাননা হচ্ছে। কিন্তু একটা কাগজের জাতীয় পতাকা বানিয়ে আমি যখন আনন্দ উচ্ছাসে একটা দৌড় দিব, সেখানে আপনার নিয়ম কানুন দিয়ে আমি কী করব? আমার আনন্দ উচ্ছাস দেশপ্রেম বেশী, নাকি আপনার নিয়ম কানুন!

মন্তব্য

টি মন্তব্য

Powered by Facebook Comments

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *